:
দুলাল আলম
জ্ঞানীনজন মাত্রই গুনিনজন-সুপথ গামী । যিনি জানেন তিনি জ্ঞান দান করতে পারেন । জানা পদ্ধতি গুলো বিদ্যার্থী ধাতস্থ করেন, নিজেকে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত করে ধন্য হন, যিনি শেখান তিনি আত্মতৃপ্ত হন, নিজের জানা বিষয়গুলো অবধারিত মৃত্যুতে পুরো বিলীন না হওয়ার আনন্দে তিনি বেঁচে থাকতে চান প্রজন্ম হতে প্রজন্মে, চিরায়ত মানবীয় কর্মে অমর হয়ে । শিক্ষকের মর্যাদা এখানে শেখানোতে বিভুষিত হয়ে পত্র পল্লবের বিন্যস্তভাব পূর্ণাঙ্গ রূপে মহান হয়ে ওঠেন গুনিন শেখানকগন ভাস্বরতায় । বিদ্যার্থীর শিখন শেখানো উপায় সিদ্ধ প্রণালীতে শিক্ষক একজন জ্ঞানের ধারক , অন্যজন জ্ঞানের বাহক , সমাদৃত হন দুজনে অন্বেষিত জ্ঞানের পরিস্ফুটনে ভূমন্ডলে বা নভোমন্ডলে ।
পাঠক্রমে গল্পে , কবিতায় প্রবন্ধে ঐতিহাসিক ধারাক্রমে অবহিতজ্ঞান দেশের ঐতিহ্য , ইতিহাস , নীতি নৈতিকতার শিল্প-সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ সম্পর্কে সঠিক তাত্ত্বিক সত্যবোধে সক্ষম হয়ে জীবন যাপনে মহানুভাব্যতা অর্জনে দেশপ্রেম, মানবতাবোধ নারী-পুরুষের সমমর্যাদা, প্রকৃতি চেতনা, বিজ্ঞান চেতনা, ভাতৃত্ববোধে জ্ঞানলগ্ধ বিবেক শানিতরুপে মুক্ত চিন্তার বিকাশে পরিচ্ছন্ন জীবন বোধে দেশের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।
শিক্ষার্থীর সামর্থ্য ও পূর্ব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্বের সাথে সামঞ্জস্য রেখে জীবনের নিগুঢ় তথ্য সম্পর্কে উদ্ভাসিত দেশ গঠনে প্রত্যেক শিক্ষার্থী শিখে , জেনে , বুঝে , ব্যবহার নিশ্চিত কল্পে ভবিতব্যে শিক্ষক হতে পারে ।
শিক্ষার উদ্দেশ্য , লক্ষ্য , ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদায় জাতীয়তাবোধের প্রতিফলন ঘটিয়ে শিক্ষার্থীর বয়স , বিষয় , ধারণ করার সক্ষমতা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে শিখনফল নির্ধারণ করা হয় এবং ধর্ম-বর্ণ , গোত্র , নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবার ওপর প্রতিফলিত হয় । শিক্ষার্থীর নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ শিল্প , সাহিত্য , বিজ্ঞান, ইতিহাস , ঐতিহ্য , জাতীয় চেতনার ভিত্তিতে সবার প্রতি সমমর্যাদা ধারণ করার স্পৃহা তৈরি করে ।
১৮৪১ খ্রিস্টাব্দে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা বিভাগে হেড পন্ডিত হিসাবে যোগদান করেন। ধীশক্তিমান পাণ্ডিত্যের অধিকারী হিসেবে তিনি যোগ্যতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হলে উক্ত কলেজে হেড পন্ডিত হিসেবে যোগদান করান হয় ।
তিনি ১৮২৯ খ্রিস্টাব্দে সংস্কৃত কলেজে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন । ঐ কলেজে ১২ বছর অধ্যায়ন করে ব্যাকরণ , অলংকার , বেদান্ত ন্যায় ও জ্যোতিষ শাস্ত্রে পান্ডিত্য অর্জন করেন । সকল পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বিদ্যাসাগর উপাধিতে ভূষিত হন ।
১৮২০খ্রিস্টাব্দে ২৬ শে সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলায় বীরসিংহ গ্রামে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর জন্মগ্রহণ করেন । ঠাকুর দাস বন্দোপাধ্যায় তাঁর পিতার নাম , শ্রী ভগবতী দেবী তাঁর মাতার নাম ছিল। “বিদ্যাসাগর” তাঁর কর্মগুণ উপাধি এবং বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বংশীয় উপাধি ছিল ।
আট বছর বয়স পর্যন্ত গ্রামের পাঠশালায় লেখাপড়া করেন । তারপর পিতার সাথে কলকাতায় শিবচরন মল্লিকের বাড়িতে এক বছর পড়ালেখা করেন ও এখানে তিনি অক্ষর জ্ঞানপ্রাপ্ত হন।
১৮২৯খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতা সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন । এ কলেজে পড়াশোনা করে তিনি নিজেকে সমসাময়িক যোগ্য পাণ্ডিত্যের অধিকারী হয়ে বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জন করেন। সরকার কর্তৃক তিনি “বিশেষ বিদ্যালয় পরিদর্শক” নিযুক্ত হলে তারই তত্ত্বাবধানে কুড়িটি মডেল স্কুল ও ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপিত হয় ।
বাংলা গদ্য সাহিত্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রথম “যতি” চিহ্নের যথাযথ ব্যবহার করে গদ্য ছন্দে শৃঙ্খলা আনয়ন করেন । শিক্ষাকে সার্বজনীন করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ে শিক্ষার উৎকর্ষতা সাধনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন ।
কৌতুকবোধ, নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, মমতা এবং পাঠকের বোধগম্যতার অভিপ্রায় যথার্থতায় তাঁকে বাংলা সাহিত্যে অমর করে রাখবে।
বড় ডানপিটে ছিলেন ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শৈশবে , তিনি তিন বছর গ্রামের স্কুলে পড়ালেখায় জীবনের প্রথম আট বছর বয়স পর্যন্ত ব্যয় করেন।
পিতামহ রামজয় তর্ক ভূষণের মৃত্যুর পর পিতা ঠাকুর দাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে কলকাতা শহরে আসেন । বাটনা বাটা সিলের মত মাইলস্টোন দেখে তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে পিতার সাথে আগ্রহ ভরে ইংরেজি অক্ষরগুলো অতি দ্রুত শিখে নেন । মেধা শক্তি দেখে পিতা ও সহচারিবৃন্দ অবাক হন এবং ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য মত দেন, যাতে ইংরেজদের বড় দোকানে অথবা তাহাদের মোসাহেবী করে অনেক অর্থ উপার্জন করতে পারেন । কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তা করেননি৷ তিনি সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হন এবং বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানার্জনে পারদর্শীতায় পান্ডিত্য অর্জন করেন ।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর লিখিত আত্মচরিত গল্পে বীরসিংহ কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের পাঠশালায় শিক্ষককে শিক্ষাদান বিষয়ে নিপুন , যত্নবান ও পরিশ্রমীদের উপযুক্ত শিক্ষক বলে অভিহিত করেছেন । বেতাল পঞ্চবিংশতি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রথম গ্রন্থ। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলঃ বর্ণপরিচয়, সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা , শকুন্তলা , মঞ্জুরি ভ্রান্তিবিলাস ইত্যাদি ।
২৯ জুলাই ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন ।
আসলে তিনি গল্পে আত্মগল্পকে নিবিড় ভাবে তুলে ধরেছেন- যেখানে একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বিষয়ে অতি যত্নবান হওয়া উচিত বলে মনে করেছেন । এ বিষয়ে যুগোপযোগী উপযুক্ত শিক্ষকের ধরন ও মর্মার্থ প্রকাশিত হয়েছে ।
নারী শিক্ষার জন্য বিধবা বিবাহ প্রচলনে , বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ নিরোধে সমাজের অভিশাপ দূরীকরণে স্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন । তাঁর আগে বাংলা উপমহাদেশে সমাজের কোথাও এমন কুপ্রথা দূরীকরণে গুণী পন্ডিতের দেখা বাঙালি সমাজের ইতিহাসে দেখা যায়নি । তাই একজন বাঙালি জাতীয় শিক্ষক হিসেবে ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে সবিশেষভাবে অভিহিত করা যায় ।
######
দুলাল আলম
(কবি, গীতিকার, লেখক)
মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার
রাজশাহী, বাংলাদেশ থেকে
মোবাইল ০১৭৭০৮৮৮৯৫৬